চীনের মহা প্রাচীর কেন, কবে তৈরি করা হয়েছিল?

great wall of china e1619987388230
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

চীনের মহা প্রাচীর কেন, কবে তৈরি করা হয়েছিল?

পৃথিবীর সপ্তাশ্চর্যের একটি হল চীনের এই মহা প্রাচীর । এটি মানুষের হাতে তৈরি সবচেয়ে বড় স্থাপত্য । পাহাড় ঘেরা অপরূপ সবুজ আরণ্যক চীনের প্রাচীর পৃথিবীর জনবহুল দেশ চীনের বেইজিংয়ে অবস্থিত পৃথিবীর সপ্তাশ্চর্যগুলোর মধ্যে একটি । এই প্রাচীর প্রায় ৫ থেকে ৮ মিটার উঁচু এবং ৮৮৫২ কিলোমিটার লম্বা । এটি ইট আর পাথর দিয়ে তৈরি করা হয় । ২২১ খ্রিস্টপূর্বাব্দে শুরু হওয়া কাজ শেষ হতে সময় লেগেছিল প্রায় ১৫ বছর । খ্রিস্টপূর্বাব্দ ২২০ থেকে ২০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে চীনের প্রথম সম্রাট কিন শি হুয়াঙের অধীনে নির্মিত প্রাচীর টি সবচেয়ে বিখ্যাত । এটি শুরু হয়েছে সাংহাই পাস এবং শেষ হয়েছে লোপনুর নামক স্থানে ।

২৪৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দে চীন বিভিন্ন খণ্ড খণ্ড রাজ্যে বিভক্ত ছিল । তাদের মধ্যে একজন রাজা, যার নাম ছিল শি-হুয়াং-টি, তিনি অন্যান্য রাজাদের সংঘবদ্ধ করে নিজে সম্রাট হন । চীনের উত্তরে গোবি মরুভূমির পূর্বে দুর্ধর্ষ মঙ্গোলিয়াদের বাস, যাদের কাজ হল লুটতরাজ করা । সেই সময় মাঞ্চুরিয়া আর মঙ্গোলিয়ার যাযাবর দস্যুরা চীনের বিভিন্ন অংশে আক্রমণ করত এবং বিভিন্ন ক্ষতি সাধন করত । ফলে দস্যুদের হাত থেকে চীনকে রক্ষা করার জন্য এই প্রাচীর তৈরি করা হয়েছিল । তাদের হাত থেকে দেশকে বাচানোর জন্য সম্রাটের আদেশে চীনের প্রাচীর তৈরির কাজ আরম্ভ হয় । প্রাচীরটি নির্মাণে এক হাজারের বেশি শ্রমিক কাজ করেছিল । চীনের অনেক রাজবংশ এ প্রাচীর নির্মাণে অপূরণীয় ভূমিকা রেখেছেন । পরবর্তিতে হান, সুই সহ আরো অনেক রাজবংশ এই দেয়ালের সংস্কার, পুনর্নির্মাণ এবং বিস্তার ঘটায় । পরে হান, সুই, উত্তরের ওয়েই, জিন, মিং সহ আরো অনেক রাজবংশ দুর্গগুলোর প্রাচীর পুননির্মাণ ও প্রসারিত করে ।

প্রাচীর টি চীনের উত্তর সীমান্তের রাজ্য সংরক্ষণের জন্য তৈরি করা হয়েছিল । এরকম অনেক গুলি প্রাচীর তৈরি করা হয়েছিল, এর মূল অংশের নির্মাণ শুরু হয়েছিল প্রায় খ্রিস্টপূর্ব ২০৮ সালের দিকে । চীনের প্রাচীরটি পাথর, ইট, কাঠ, খড়ি, চুন, মাটি এবং কঙ্করের মতো উপকরণ গুলোর সংমিশ্রণে তৈরি । প্রাচীর তৈরি হয়েছিল চিহলি-পুরনো নাম পোহাই উপসাগরের কূলে শানসীকুয়ান থেকে কানসু প্রদেশের চিয়াকুমান পর্যন্ত । চীনের প্রথম সম্রাট কিং সি হুয়াং এটি প্রথম ব্যবহার করেছিলেন এবং শত্রুর হাত থেকে নিজের সাম্রাজ্যকে রক্ষার জন্য দীর্ঘ প্রাচীর নির্মাণ করেছিলেন । এই প্রাচীর থেকে সীমান্ত রক্ষীরা সীমান্ত পাহারা দিত । সীমান্ত রক্ষীরা ভিন্ন ভিন্ন দলে ভাগ হয়ে এই সীমান্ত পাহারা দিত ।

কিন্তু, অনেক সময় মঙ্গল দস্যুরা প্রাচীর ভেঙ্গে চীনা লোকালয়ে ঢুকে লুটপাট করতো । এত কিছুর পরেও চীনের ওপর মঙ্গোলদের আক্রমণ থামেনি । তারা নিয়মিত আক্রমণ চালিয়ে যেত । পরবর্তীতে তারা নির্মিত দেয়াল গুলোর অনেক ক্ষতি করেছিল । এসব ঘটনার স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে প্রাচীরের অনেক জায়গায় এখনো কিছু কিছু ভাঙা অংশ রয়েছে  চীনারা নিজেরা পাচিলের বাইরে চাষবাস আরম্ভ করেছে । ক্ষতিগ্রস্ত অংশগুলো গ্রাম্য খেলার মাঠ এবং বাড়ি ও রাস্তা তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় পাথরের উৎস হিসেবে ব্যবহৃত হয় ।

ধীরে ধীরে চীনের মহা প্রাচীর দর্শনার্থীদের আকর্ষণের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়ে যায় । ইতিহাস প্রতিদিন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে চীনের মহা প্রাচীরের সৌন্দর্য উপভোগ করতে আসেন লাখো দর্শনার্থী । প্রতিদিন সকাল থেকে শুরু হয় দর্শনার্থীদের পাহাড়ের চূড়ায় ওঠার প্রতিযোগিতা । পাহাড়ের চূড়ায় ওঠার এই প্রতিযোগিতা চলে সূর্য ডোবার আগ পর্যন্ত । ব্যাপক পরিচিতির ফলে একে প্রতি নিয়ত সামলাতে হচ্ছে লাখ লাখ পর্যটকদের চাপ । উন্নত পর্যটন এলাকার কাছে মেরামত কৃত অংশ পর্যটন পণ্যের বিক্রয় স্থল হয়ে উঠেছে । মহা প্রাচীর দেখার সুবিধার জন্য পাহাড়সহ অন্যান্য উঁচু স্থানে সংকেত টাওয়ার স্থাপন করা হয়েছিল । বহু কবিতা এবং সাহিত্যকর্মে চীনের মহা প্রাচীরটিকে ‘দ্য আর্থ ড্রাগন’ বলা হয়েছে ।

বিশ্বের গৌরব চীনের এই প্রাচীর অনেকটাই ধ্বংসের মুখোমুখি। বর্তমানে প্রাচীর টির অনেক অংশই ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে গেছে । প্রাচীরটির প্রায় ১/৩ অংশ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিলীন হয়ে গেছে । এর কিছু অংশ আবার অনেক বেশি রকমের সংস্কারও করা হয়েছে । এই চীনের মহা প্রাচীরের যে অংশ গানসু প্রদেশে অবস্থিত তার ৬০ কিলোমিটার দীর্ঘ অংশ আগামী ২০ বছরের মধ্যেই ধ্বংস হয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে । ২০১৪ সালে লাইয়াওনিং এবং হেবেই প্রদেশের বর্ডারের কাছের দেয়ালগুলো কনক্রিট দিয়ে নতুন করে সংস্কার করা হয়েছে । চীন সরকার যদি এর সংস্কারের প্রতি মনোযোগী হয়ে ওঠে তাহলে আরো বহুদিন এই বিশ্ব ঐতিহ্যকে এ পৃথিবীর বুকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে ।

 


Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •