প্রকৃতির মায়াবিনী সুন্দর স্থান বান্দরবানের দেবতাখুম

Debotakhum6
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

দেবতাখুম!

দেবতাখুম বান্দরবান জেলার একটি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত জায়গা। এখানে দুইপাশে উঁচু পাহাড়ের মাঝখানে স্বচ্ছ পানি প্রবাহিত হতে থাকে। এটি পর্যটকদের জন্য একটি আকর্ষণীয় স্থান। দেবতাখুম যাওয়ার উপায় হলো দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে প্রথমে বান্দরবানের রোয়াংছড়ি আসতে হবে।

বান্দরবান জেলা শহর থেকে ২০ কিঃমিঃ দূরের রোয়াংছড়ি উপজেলার শীলবাঁধা পাড়ায় দেবতাকুমের অবস্থান। খুমের গভীরতা এখানে ৫০ থেকে ৭০ ফিট। আর দৈর্ঘে ৬০০ ফিট। এটি বান্দরবানের আরেক জনপ্রিয় ভ্রমণ স্থান ভেলাখুম থেকে অনেক বড় এবং অনেক বেশি ওয়াইল্ড। পাহাড়ে ট্রেকিং বরাবরই রোমাঞ্চকর। এই রোমাঞ্চের হাতছানিতে আপনি যখন ট্রেকিং করে দেবতাকুম এসে পৌঁছাবেন, প্রকৃতির রূপ লাবণ্যে আপনি মুগ্ধ হয়ে যাবেন। দুই পাশে উঁচু পাথুরে ঢাল, কলকল শব্দে বয়ে যাও পাহাড়ি ঝিরি, আর শুনশান খুমের পাড়ে নিজেকে আবিষ্কার করবেন ভিন্ন এক স্বর্গীয় পরিবেশে! যে পরিবেশে নিজেকে বিলীন করে দিতে ইচ্ছে করে প্রকৃতির মাঝে।

কিভাবে দেবতাখুম যাবেন?

দেবতাকুম যেতে আপনার প্রান্ত থেকে বান্দরবান আসতে হবে। রাতের বাসে আসাই ভালো। ঢাকা থেকে এসি – নন এসি সব ধরণের বাসই বান্দরবান যায়। নন এসির মধ্যে শ্যামলী, সৌদিয়া, ইউনিক, ডলফিন, সেন্টমার্টিন, এস আলম ইত্যাদি পরিবহনের বাস পাবেন। বাস ছাড়ে কলাবাগান, ফকিরাপুল ও সায়েদাবাদ থেকে। রাত এগারোটার মধ্যে লাস্ট বাস ছেড়ে যায়। ভাড়া ৫৮০ থেকে ৬২০ টাকা। এসি বাসের ভাড়া ১০০০ থেকে ১৫০০ টাকার মধ্যে।

ট্রেনে যেতে চাইলে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামগামী যেকোনো ট্রেনে উঠতে হবে। সোনার বাংলা এক্সপ্রেস, সূবর্ণ এক্সপ্রেস, তূর্ণা নিশীথা, চট্টলা, মহানগর ও গোধুলী সহ অনেকগুলো ট্রেইন ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। ট্রেন ও আসন ভেদে ভাড়া ২০০ থেকে ১০০০ টাকার মধ্যে।

চট্টগ্রাম থেকে বান্দরবানের বাস ছাড়ে নতুন ব্রিজ, দামপাড়া ও বহদ্দারহাট বাস টার্মিনাল থেকে। বহদ্দারহাট থেকে ৩০ মিনিট পরপর ‘পূর্বাণী’ ও ‘পূরবী’ নামে দুটি পরিবহনের বাস ছাড়ে। ভাড়া ২২০ টাকা।

বান্দরবান থেকে কচ্ছপতলী

বান্দরবান থেকে দেবতাখুম যেতে হলে প্রথমে যেতে হবে রোয়াংছড়ি উপজেলার কচ্ছপতলী আর্মি ক্যাম্পে। বান্দরবান শহর থেকে রোয়াংছড়ির দূরত্ব ২০ কিঃমিঃ। রোয়াংছড়ি থেকে কচ্ছপতলী ৫/৬ কিঃমিঃ। প্রথমে বাসে করে রোয়াংছড়ি, পরে ওখান থেকে সিএনজি নিয়ে কচ্ছপতলী যাওয়া যায়। বান্দরবান থেকে প্রতি ঘন্টায় রোয়াংছড়ির বাস ছাড়ে, ভাড়া ৬০ টাকা। আর রোয়াছড়ি থেকে কচ্ছপতলীর সিএনজি ভাড়া ১৫০ টাকার মতো। এছাড়া আপনি চাইলে বান্দরবান শহর থেকে সরাসরি জিপেও কচ্ছপতলী চলে যেতে পারেন। জিপ ভাড়া ১৮০০ টাকা। এক জিপে ১২/১৩ জন বসতে পারবেন।

কচ্ছপতলী থেকে দেবতাখুম

কচ্ছপতলীতে প্রথম কাজ হবে ওখানকার আর্মি ক্যাম্পে গিয়ে রিপোর্ট করা। সেখানে সবার জাতীয় পরিচয় পত্র বা অন্যকোনো ফটোআইডির ফটোকপি জমা দিয়ে পারমিশন নিতে হবে। ফটোকপি ঢাকা থেকেই করে নিবেন। যেহেতু ওখানে ফটোকপি করার কোনো দোকান পাওয়া যাবেনা। এরপর আর্মিকে বললে তারা গাইড ঠিক করে দিবে। আপনি চাইলে নিজেও গাইড ঠিক করতে পারবেন। গাইড ফি ৫০০ টাকা।

কয়েকজন গাইডের নাম্বার

রুন্ময় লাল 01857-272095
চিকু 01890-170803

গাইড ঠিক করার পর ট্রেকিং শুরু করুন দেবতাকুমের উদ্দেশ্যে। এটি মোটামোটি মধ্যম মানের একটি ট্রেকিং রুট। কচ্ছপতলী থেকে দেবতাখুম পৌঁছাতে আপনার ১.৫ থেকে ২ ঘন্টার মতো সময় লাগবে। পাহাড়, বন, নদী ঝিরির পাশ দিয়ে আপনার ট্রেকিং চলতে থাকবে। ঝিরি পার হতে কয়েকবার। একসময় পৌঁছে যাবেন শীলবাঁধা পাড়ায়। এই পাড়াই মূলত আপনার বেজক্যাম্প। পাড়ার পাশে শীলবাঁধা ঝর্ণা নামে একটি ঝর্ণা আছে। যাওয়া বা আসার পথে ওটাও দেখে আসতে পারবেন।

এই পাড়া থেকে দেবতাকুম যেতে ৩০ মিনিট হাঁটতে হবে। চারপাশে পাখির ডাক, সবুজ বন, ছড়ানো ছিটানো ছোট বড় পাথর, আর কলকল শব্দে অবিরাম বয়ে যাওয়া ঝিরির পাশ দিয়ে শুধু হেঁটে চলা। দেবতাকুমে বাঁশের ভেলায় ভেসে আপনি অনায়াসে কাটিয়ে দিতে পারবেন অনেকটা সময়।

Debotakhum

কোথায় খাবেন

সকালের ব্রেকফাস্ট বান্দরবান শহরেই করে নিন। বাসস্ট্যান্ডের পাশেই অনেকগুলো রেস্টুরেন্ট আছে। এর মধ্যে রূপসী বাংলা রেস্টুরেন্ট ও কলাপাতা রেস্তোরা মানসম্পন্ন। ৫০ থেকে ৭০ টাকার মধ্যে ব্রেকফাস্ট হয়ে যাবে। কচ্ছপতলী পৌঁছে ট্রেকিং শুরু করার আগেই দুপুরের খাবারের অর্ডার দিয়ে নিন। নয়তো পরে ট্রেকিং শেষ করে এসে খাবার পাবেন না। কচ্ছপতলীতে ৩/৪টি খাবারের দোকান আছে। আপনি অর্ডার করলেই মূলত তারা রান্না করবে। মুরগী মাংস, ডাল আর আলুভর্তা পাবেন মেনু হিসেবে। খাবার খরচ আসবে ১০০ থেকে ১৫০ টাকার মতো।

দেবতাখুম ভ্রমণের উপযুক্ত সময়

সারাবছরই দেবতাকুম যাওয়া যায়। তবে ভরা বর্ষায় অনেক সময় ঝিরি ও খুমে পানি অতিরিক্ত বেড়ে গেলে আর্মি তখন দেবতাকুম যাওয়ার পারমিশন দেয়না। আবার শীতের শেষ থেকে গ্রীষ্মের শুরু পর্যন্ত পানি খুব কমে যায়, তখন আপনার ভালো নাও লাগতে পারে। অর্থাৎ জুন থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত দেবতাকুম যাওয়ার ভালো সময়। যেতে চাইলে এই সময়ের মধ্যেই ভ্রমণ পরিকল্পনা করুন।

কোথায় থাকবেন

আপনি সকালে বান্দরবান থেকে দেবতাকুমের উদ্দেশ্যে রওনা দিলে সন্ধ্যার মধ্যেই আবার শহরে এসে পৌঁছাতে পারবেন। তাই আপনি চাইলে রাতের খাবার শেষে সেদিনই ঢাকা অথবা আপনার গন্তব্যে ফিরে আসতে পারেন। আর থেকে যেতে চাইলে বান্দরবান শহরে বিভিন্ন মানের বেশ কিছু হোটেল রয়েছে।

বান্দরবানের কয়েকটি হোটেল

হোটেল হিল ভিউ: বান্দরবান শহরের মূল বাস স্ট্যান্ডের পাশেই এই হোটেলটি। মোটামুটি বেশ ভালো মানের একটি হোটেল। রুম ভাড়া ১২০০ থেকে ২৮০০ টাকা।

হোটেল প্লাজা: এটিও বেশ ভালো মানের একটি হোটেল। এই হেটেলের নিজস্ব রেস্টুরেন্ট আছে। ছিমছাম গুছানো সুন্দর হোটেল। রুম ভাড়া পড়বে ১৫০০ থেকে ৬০০০ টাকা।

রিভার ভিউ: শহরের ভিতর সাঙ্গু নদীর পাড়ে এই হোটেলটির অবস্থান। রুম ভাড়া ৬০০ থেকে ১৮০০ টাকা।

হোটেল নাইট হ্যাভেন: এটিও শহর থেকে ৪ কিঃমিঃ দূরে নীলাচলের কাছে। এর রুম ভাড়া ১৫০০ থেকে ৪০০০ টাকা।

পর্যটন মোটেল: এটি শহর ৪ কিঃমিঃ দূরে মেঘলা পর্যটন কমপ্লেক্স এর কাছে অবস্থিত। রুম ভাড়া ক্যাটাগরি ভেদে ১২০০ থেকে ২৫০০ টাকা।

দেবতাকুম ভ্রমণ তথ্য ও সতর্কতা

*কচ্ছপতলীতে গিয়ে আর্মি ক্যাম্পে রিপোর্ট না করে আপনি দেবতাকুম যেতে পারবেন না।
*পারমিশনের জন্য জাতীয় পরিচয়পত্র বা অন্যকোনো ফটো আইডির ফটোকপি লাগবে। ওখানে ফটোকপির দোকান নেই। ঢাকা থেকেই করে নিতে হবে।
*কচ্ছপতলী পর আপনাকে নেটওয়ার্কের বাইরে থাকতে হবে।
*ট্রেকিংয়ের জন্য ট্রেকিং বুট ব্যবহার করুন। চাইলে প্লাস্টিক বা রাবারের স্যান্ডেল ব্যবহার করতে পারেন।
*খুমে ভেলায় চড়ার জন্য লাইফ জ্যাকেট সাথে করে নিয়ে যাবেন।
*চান্দের গাড়ির ছাদে উঠবেন না। আঁকাবাঁকা রাস্তায় ছাদে উঠা বিপদজনক।
*অনুমতি না নিয়ে আদিবাসীদের ছবি তুলবেন না। এটি সাধারণ কাণ্ডজ্ঞান।
*আদিবাসীদের কালচারের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করুন। এমন কিছু বলবেন না, যেটি অন্যকোনো জাতির মানুষ আপনাকে বললে আপনারও খারাপ লাগতো।
*কোনো প্রকার অপচনশীল বস্তু পাহাড়ে ফেলবেন না। শুধু পাহাড় নয়, শহরেও ফেলবেন না। এটি আপনার ব্যক্তিত্বকে রিপ্রেজেন্ট করে।

Debotakhum@


Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •