দ্বীনের নসীহত

ইসলামী আলোয় আলোকিত হোক জীবন

করোনার মধ্যেই দুঃসংবাদ, বাংলাদেশের দিকে ধেয়ে আসছে পঙ্গপালের ঝাঁক

pongopal 20200425205508
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

কেনিয়ায় ফসলের ক্ষেতে পঙ্গপালের যে আক্রমণ তা এখন গোটা দেশকে আচ্ছন্ন করে ফেলছে। অস্ট্রেলিয়ায় কেয়ামত সদৃশ দাবানল পৃথিবীবাসীকে হতবাক করে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে গত বিশ বছরে বড় বড় ঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা তাদের সাজানো জীবনযাত্রাকে বার বার তছনছ করেছে।
বর্তমানে চলছে চীনসহ বিশ্বের বহু রাষ্ট্রে আতঙ্ক। একটি শহরেই দুই কোটি মানুষ পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন। অসহায়ের মতো বহু মানুষ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে। তাদের লাশ নেয়ার লোকেরা ভীত সন্ত্রস্ত।
চীনের সাথে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে বহু দেশের। দক্ষিণ কোরিয়ায় এ আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। চীনের ৩৪টি প্রদেশই আতঙ্কের আওতায় এসে গেছে। ঈমানদাররা এসবে যত না ভয় পায়, তারচেয়ে বেশি ঈমানী উপলব্ধি তাদের বাড়ে। গুনাহ খাতা থেকে তারা তওবা করে।

করোনাভাইরাস বিস্তারের আগেই আফ্রিকা এবং এশিয়ার বেশকিছু দেশে পঙ্গপালের হানার খবর এসেছিল সংবাদ মাধ্যমগুলোতে; কিন্তু মাঝে করোনা বিস্তারের কারণে পঙ্গপালের খবর বেমালুম ভুলে গিয়েছিল মানুষ। এবার পঙ্গপাল নিয়ে ভাবতে হচ্ছে ভারত ও বাংলাদেশের মানুষকে। কারণ, ভারতের দ্য হিন্দু পত্রিকা দেশটির সরকারী কর্মকর্তার বরাত দিয়ে পঙ্গপালের যে সংবাদ পরিবেশন করেছে, তা বাংলাদেশের জন্য এক ভয়াবহ বিপদের ইঙ্গিত বহন করছে।

দ্য হিন্দুর রিপোর্টে বলা হয়েছে, পঙ্গপালের ঝাঁক ভারত হয়ে বাংলাদেশের দিকে ধেয়ে আসছে। করোনায় এমনিতেই অর্থনীতি পুরোপুরি বিপর্যস্ত। এর মধ্যে যদি পঙ্গপাল হানা দেয়, তাহলে পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তা বলাই বাহুল্য। আরেক ভয়াবহ বিপদের অশনিসঙ্কেত দেখা যাচ্ছে পঙ্গপালের হানার খবরে।

আজ (শনিবার) ভারতের দ্য হিন্দু পত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্টে এ শঙ্কার কথা জানানো হয়। বলা হচ্ছে, এরই মধ্যে পঙ্গপালের একটি ঝাঁক ভারতে প্রবেশ করেছে। আরেকটি ঝাঁক দক্ষিণ এশিয়ার কৃষিজমিতে ছড়িয়ে পড়ার লক্ষ্যে পাড়ি দিচ্ছে ভারত মহাসাগর।

বেশ কিছুদিন ধরেই সংবাদপত্রে পঙ্গপালের উপস্থিতির খবর ছিল। বিশেষ করে আফ্রিকায়। মহাদেশটির বেশকিছু দেশ ইতিমধ্যে পঙ্গপালের আক্রমণে বিপর্যস্ত। করোনার পূর্ববর্তী সময়ে পঙ্গপালের জন্য পাকিস্তানেও জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছিল।

এবার দ্য হিন্দু যে সংবাদ প্রকাশ করেছে, তা বাংলাদেশের জন্যও এক বড় দুঃসংবাদ বয়ে আনছে। কারণ ভারত মহাসাগর পাড়ি দিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার কৃষিজমিতে যদি পঙ্গপাল হানা দেয়, তাহলে কৃষিজ ফসল একেবারে ধ্বংস হয়ে যাবে।

পঙ্গপাল যে ভারতে হানা দেবে, সে ব্যাপারে আগেই বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) সতর্ক করেছিল ভারতকে। তারা পঙ্গপালের সম্ভাব্য আক্রমণের সময় হিসেবে মে মাসকেই ধরে নিয়েছিল। তবে এফএও’র ওই রিপোর্টে বাংলাদেশের কথা উল্লেখ না থাকলেও দ্য হিন্দু আজ যে রিপোর্ট প্রকাশ করেছে, সেখানে রয়েছে বাংলাদেশের নাম।

দ্য হিন্দুর রিপোর্টে বলা হয়েছে, পঙ্গপালের একটি দল ভারত মহাসাগর পাড়ি দিয়ে সরাসরি দক্ষিণ এশিয়ার বিশেষ করে ভারতের উপকূলীয় এলাকায় কৃষিজমিতে আছড়ে পড়তে পারে। এরপরই পঙ্গপালের সেই দলের গন্তব্য হতে পারে বাংলাদেশ।

করোনা মোকাবিলায় এমনিতেই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া পুরোপুরি বিপর্যস্ত। এরই মধ্যে পঙ্গপালের আক্রমণ। দ্য হিন্দুকে ভারতীয় কর্মকর্তারা বলছেন, করোনার এই সময়ে পঙ্গপালের আক্রমণ ঠেকাতে ‘দুই ফ্রন্টে’ যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে ভারত সরকারকে। একটি হচ্ছে করোনাভাইরাস মহামারি এবং অন্যটি পঙ্গপাল। পঙ্গপালের কারণে খাদ্যনিরাপত্তা ভয়াবহ হুমকির মুখে। এ কারণে ভয়াবহ এই দুটি দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিচ্ছে ভারত।

ভারত সরকারের ওই সূত্রের বরাত দিয়ে দ্য হিন্দু পত্রিকায় লেখা হয়েছে, ‘হর্ন অব আফ্রিকা থেকে একঝাঁক পঙ্গপাল মরু অঞ্চলের আরেক দল পঙ্গপালের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। এসব ঝাঁক মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইয়েমেন, বাহরাইন, কুয়েত, কাতার, ইরান, সৌদি আরব এবং পাকিস্তান হয়ে ভারতেও হানা দিচ্ছে। ইতিমধ্যে ভারতের পাঞ্জাব ও হারিয়ানা রাজ্যে ঢুকে পড়েছে একদল পঙ্গপাল। এদিকে পঙ্গপালের আরও একটি দল ভারত মহাসাগর পাড়ি দিচ্ছে। ভারতীয় উপদ্বীপের কৃষিজমিতে হানা দেয়ার পর এ দলটি বাংলাদেশের দিকে যেতে পারে। পঙ্গপালের এ দুই দল মিলে এ অঞ্চলে ফসলের মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে। এতে মারাত্মকভাবে খাদ্যনিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ার শঙ্কা রয়েছে।’

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও বা ফাও) তাদের ওয়েবসাইটে জানিয়েছে, পঙ্গপালের একটি দল ১ বর্গকিলোমিটারেরও কম এলাকা থেকে শুরু করে ১০০’র বেশি বর্গকিলোমিটারের ফসল একসঙ্গে নষ্ট করে দেয়ার ক্ষমতা রাখে। এক বর্গকিলোমিটারের ঝাঁকে থাকতে পারে ৪ কোটিরও বেশি পঙ্গপাল। যারা একদিনে ৩৫ হাজার মানুষের খাবার সাবাড় করে দিতে পারে।

ফাও জানিয়েছে, আফ্রিকায় ব্যাপক ক্ষতিসাধন করেছে পঙ্গপালের দল। পঙ্গপালের উৎপাতে ইতিমধ্যে মহাদেশটিতে খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে। এবার এশিয়া মহাদেশে যদি পঙ্গপালের বিস্তার ঘটে, তাহলে তা খাদ্য মহামারিতে রূপ নিতে পারে। জাতিসংঘের নিরাপাত্তা কাউন্সিলকে এক ব্রিফিংয়ে ফাওয়ের খাদ্য কর্মসূচির নির্বাহী পরিচালক ডেভিড বেসলি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন, বর্তমান মহামারিটি এখন ‘ক্ষুধার্ত মহামারি’তে পরিণত হতে পারে।

গত ২১ এপ্রিল একটি ছবি প্রকাশ করা হয়। যেখানে দেখা যাচ্ছে, মরুভূমির পঙ্গপাল পূর্ব আফ্রিকা, ইয়েমেন এবং দক্ষিণ ইরানে এরই মধ্যে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে বিশ্বে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় পঙ্গপালের উৎপাতের ঘটনা ঘটতে পারে এ বছর। পঙ্গপালের উৎপাত মোকাবিলায় এফএও সাত কোটি ডলারের জরুরি তহবিল গঠনের আহ্বান জানিয়েছে।

একদিকে করোনা আর অন্যদিকে পঙ্গপাল।পঙ্গপালের তীব্র আক্রমণে বিপাকে পড়েছে পাকিস্তান।জারি করা হয়েছে জরুরি অবস্থা।ভারতেও ঢুকে পড়েছে পতঙ্গটি। এছাড়া সোমালিয়াতেও সম্প্রতি এ নিয়ে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে। জাতিসংঘের এক সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, ইথিওপিয়া, কেনিয়া, সোমালিয়াসহ পূর্ব আফ্রিকায় পঙ্গপালের আক্রমণে মানবিক সংকট তৈরি হতে পারে। জিবুতি ও ইরিত্রিয়ায় ৩৬ হাজার কোটি পতঙ্গের আক্রমণে খাদ্য নিরাপত্তায় ভয়াবহ হুমকি তৈরি হয়েছে।কেনিয়ার ৮০ হাজার হেক্টর জমির ফসল সাবার করে দিয়েছে এই পঙ্গপাল।

ভারত-পাকিস্তানের বাইরে সৌদি আরবও পঙ্গপালের আক্রমণের মুখে পড়েছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম বলছে, পতঙ্গটির আক্রমণ দেশটির কৃষি খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের জন্য ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করেছে।

আফ্রিকায় পরিস্থিতি সামাল দিতে ৭ কোটি ডলারের অনুদান চেয়েছে জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন। সংস্থাটির প্রধান মার্ক লোকক বলেন, আফ্রিকায় এই ভয়াবহ পঙ্গপাল উদ্বেগজনক হারে ফসল ধ্বংস করছে। ইতোমধ্যেই খাদ্য স্বল্পতায় থাকা পরিবারগুলো তাই আরও বিপাকে পড়েছে।

পঙ্গপাল মূলত এক প্রকার পতঙ্গ। এটি আর্কিডিডি পরিবারে ছোট শিংয়ের বিশেষ প্রজাতি যাদের জীবন চক্রে দল বা ঝাঁক বাঁধার পর্যায় থাকে। এই পতঙ্গগুলো সাধারণত একা থাকে। তবে বিশেষ অবস্থায় তারা একত্রে জড়ো হয়। তখন তাদের আচরণ ও অভ্যাস পরিবর্তিত হয়ে সঙ্গলিপ্সু হয়ে পড়ে। পঙ্গপাল ও ঘাস ফড়িংয়ের মধ্যে কোন পার্থক্যগত শ্রেণীবিন্যাস নেই। বিশেষ অবস্থায় তাদের প্রজাতিগুলোর একত্রিত হওয়ার যে স্বতন্ত্র প্রবণতা দেখা যায় সেটাই মূল পার্থক্য।

নতুন ধরনের পঙ্গপালের ১০ লাখ পতঙ্গের একটি ঝাঁক একদিনে ৩৫ হাজার মানুষের খাবার খেয়ে ফেলতে পারে। এদের একটি ঝাক প্রায় ১ বর্গ কিলোমিটার এলাকার সমান জায়গা দখল করে।আগামী এপ্রিলে এই পঙ্গপাল নতুন করে বংশবৃদ্ধি করতে পারে। এ সময়টিকে পঙ্গপালের বংশবৃদ্ধির সময় বলে বিবেচনা করা হয়।এরা যে পঙ্গপালের ঝাক যে এলাকা দিয়ে যায় সেই এলাকা একেবারে তছনছ করে ফেলে।

প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা

পঙ্গপাল নিয়ন্ত্রণে বাতাসে বা মাটিতে কীটনাশক ব্যবহারের প্রচলন রয়েছে। তবে আফ্রিকায় পঙ্গপালের যে ভয়াবহতা তাতে শুধু কীটনাশক ব্যবহারে ফল মিলবে না বলে মনে করছেন জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা। তাই পরিস্থিতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।

বিশ্লেষকরা পঙ্গপালের আক্রমণে সৃষ্ট এই পরিস্থিতির জন্য জলবায়ু পরিবর্তনকে দায়ী করছেন। জাতিসংঘের পঙ্গপাল পূর্বাভাস বিষয়ক কর্মকর্তা কিথ ক্রিসম্যান বলেন, ওমানের মরুভূমিতে ঘূর্ণিঝড়ের কারণে অনেক বৃষ্টি হওয়ায় এই পঙ্গপালগুলো আফ্রিকায় চলে গেছে। তিনি বলেন, আমরা জানি ঘূর্ণিঝড় থেকেই্ এই পতঙ্গের আগমন ঘটে। বিগত ১০ বছরে ভারত সাগরে ঘূর্ণিঝড়ের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে।


Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •