দ্বীনের নসীহত

ইসলামী আলোয় আলোকিত হোক জীবন

করোনায় কেমন আছে জাপানের মুসলিমরা

japan
উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে জাপানের বিভিন্ন অঞ্চলে মুসলিম সম্প্রদায় বিস্তার লাভ করে। জাপানে মুসলমানের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার দশ শতাংশ। বর্তমানে জাপানে ২ লক্ষাধিক মুসলমানের বসবাস যার মধ্যে প্রায় ৫০ হাজার মুসলমান জাপানিজ বংশভূত, যাদের বেশিরভাগ বৈবাহিক সূত্রে মুসলমান হয়েছে।
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

মুহাম্মদ হযরত আলী

উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে জাপানের বিভিন্ন অঞ্চলে মুসলিম সম্প্রদায় বিস্তার লাভ করে। জাপানে মুসলমানের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার দশ শতাংশ। বর্তমানে জাপানে ২ লক্ষাধিক মুসলমানের বসবাস যার মধ্যে প্রায় ৫০ হাজার মুসলমান জাপানিজ বংশভূত, যাদের বেশিরভাগ বৈবাহিক সূত্রে মুসলমান হয়েছে।

পুরো দেশ জুড়ে রয়েছে শতাধিক মসজিদ ও মুসল্লা। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে আসা ধর্মপ্রাণ মুসলমান এবং বিশেষ করে তবলিগ জামাতের সদস্যদের মেহনতের ফলে এই সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলছে। জুম্মার নামাজে মসজিদ ভেদে ৫০০-১০০০ লোকের জমায়েত হয়। প্রায় সবমসজিদেই প্রতি শনিবার এশার পরে ইসলামের আলোচনা ও রাতের খাবারের আয়োজন থাকে। এর মাধমে ওই এলাকায় বসবাসরত মুসলমানদের মাঝে চমৎকার সম্প্রীতির বন্ধন গড়ে উঠে।

চিনের উহান শহর থেকে জ্বর নিয়ে আসা ৩০ বছরের এক যুবকের মাধ্যমে ১৬ জানুয়ারী জাপানে প্রথম করোনা রোগী সনাক্ত হয়। এরপর থেকেই বাড়তে থাকে করোনা রোগীর সংখ্যা। মনে করা হচ্ছিল টোকিও অলিম্পিক যাতে কোনো ভাবে বাধাগ্রস্ত না হয়, সেজন্য সরকার এই ভাইরাসে আক্রান্তের তথ্যটা গোপন করে যাচ্ছিল।

শেষমেশ পরিস্থিতি সামাল দিতে না পারায় জাপান সরকার অলিম্পিক বন্ধ করে। এরা পৃথিবীর অন্যকোন দেশকে পাত্তা না দিলেও আমেরিকাকে গুরু হিসেবেই মানে।আমেরিকার নিউইয়র্ক শহরে করোনার ভয়াবহতায় জাপান সরকারের টনক নড়ে উঠে। বর্তমানে জাপানে করোনা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে দশ হাজারের অধিক, যার মধ্যে শুধু টোকিওতেই এই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে তিনহাজার।

এখন পর্যন্ত জাপানে করোনায় মৃত্যু হয়েছে দুইশতাধিক মানুষের। টোকিওর বন্দরে নোঙর করা প্রমোদতরী ডায়মন্ড ক্রজে কোয়ারেন্টাইনে থাকা করোনা রোগীদের এই হিসাবে যুক্ত করা হয়নি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গত ৩১ মার্চ জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজোআবে টোকিও সহ ৬ টি বিভাগে জরুরি অবস্থা ঘোষণা দিলেও অবস্থার অবনতি হওয়ার কারনে চলতি মাসের ১৭ এপ্রিল সম্পূর্ণ দেশজুড়েই জরুরি অবস্থা জারি করে।

বিভিন্ন ধর্মীয় প্রার্থনালয়ে জনসমাগম না করার জন্য অনুরোধ করেন। এখানে কারও শরীরে করোনা ভাইরাসের উপস্থিতি আছে কিনা তা সহজেই পরীক্ষা করে বলে দেওয়া যায়, তবুও হাসপাতালগুলোতে সন্দেহভাজন সবার পরীক্ষা করা হচ্ছে না। জাপান শুধু সেসব লোকদের টেস্ট করছে, যাদের সম্পূর্ণভাবে করোনা ভাইরাসের উপসর্গ দেখা দেওয়ায় মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুকি রয়েছে।

পৃথিবীর সবচেয়ে জনবহুল শহর জাপানের রাজধানী টোকিও। টোকিও শহরে আক্রান্তের সংখ্যা তুলনামূলক অনেক বেশি হওয়ায় টোকিওর বিভিন্ন মসজিদ বন্ধ রাখা হয়। জরুরি অবস্থা ঘোষণার আগেই তুর্কি ও ইন্দোনেশিয়ানদের দ্বারা পরিচালিত মসজিদগুলোতে জুম্মার নামাজ বন্ধ করে দেয়। বাংলাদেশিদের দ্বারা পরিচালিত এবং দাওয়াত ও তবলিগের আলমি শুরার মারকাজ হিসেবে সুপরিচিত মক্কি মসজিদ স্বল্প পরিসরে উন্মুক্ত রাখা হয়।

মসজিদ বন্ধ না করে ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদেমসহ অল্প কিছু মুসল্লি নিয়ে জুম্মার নামাজ অনুষ্ঠিত হয় এবং এলাকার অন্যান্য মুসল্লিবৃন্দ নিজ নিজ বাসায় নামাজ আদায় করে। তবলিগ জামাতের আরেকটি বড় আয়তনের মারকাজ মসজিদ গুনমা জেলায় অবস্থিত। সেখানে লোক সমাগম এড়ানোর জন্য করোনা বিস্তারের শুরুর দিকে জুম্মার নামাজ দুই জামাতে অনুষ্ঠিত হলেও পরামর্শ মোতাবেক বর্তমানে অল্প কিছু মুসল্লিদের নিয়েই সংক্ষিপ্ত আকারে এক জামাতেই আদায় হয়। জাপানে প্রতি দুইমাস পর পর তবলিগ জামাতের সারাদেশের মাশওরা বা পরামর্শ হয়ে থাকে।

৬ বিভাগে জরুরি অবস্থা ঘোষণার পরপরই ৫ এপ্রিল গুনমা মারকাজে সারাদেশের তবলিগের কাজের বিষয়ে পরামর্শ হয়। সেখানে পরিস্থিতি অনুকুল না হওয়া পর্যন্ত সকল ধরনের তাবলীগের কার্যক্রম স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় এবং চলমান জামাতগুলোকে নিজ এলাকায় ফিরে যেতে বলা হয়।

চলমান সংকটময় অবস্থায় আসন্ন মাহে রমজানের প্রস্তুতিকে সামনে রেখে ১৭ এপ্রিল জাপানের বিজ্ঞ ওলামায়ে কেরাম অনলাইনভিত্তিক পরামর্শের আয়োজন করেন। সেখানে সর্বসম্মতিক্রমে তারাবির নামাজ ব্যক্তিগতভাবে বাসায় আদায় এবং রমজান উপলক্ষে কোন প্রকার জনসমাবেত না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

জাপানে মুসলমানদের কবরস্থান খুব কম শহরেই পাওয়া যায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কেউ মারা গেলে মৃতদেহ দেশে পাঠানো হয়। জাপানিজদের কবরস্থানে লাশ দাফন করতে প্রায় ৮-১০ লাখ টাকা খরচ লাগে। উপরন্তু সেই কবরস্থানগুলো জাপানিজ বৌদ্ধদের জন্য হওয়ায় সহজে ওরা সম্মতি দিতে চায় না।

বর্তমানে ফ্লাইট বন্ধ হওয়ায় করোনা আতঙ্কে অনেক মুসলমানরাই এ ব্যাপারে বেশ উদ্বিগ্ন,কারন লাশ দেশে নেয়ার উপায় নাই।আমি শিজুওকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়নরত। আমরা শিজুওকাবাসীসহ অনেকেই এখন নতুন কবরস্থানের জন্য জায়গা খুজছি। জাপানে কোন করোনা রোগী মারা গেলে জাপানের পুলিশ বিভাগতাদের নিয়ম অনুযায়ী মৃতদেহ সৎকার করে। তবে প্রশাসনের সাথে পরামর্শ করে মুসলমানদের লাশ স্যানিটাইজার ছিটিয়ে প্যাকেট করে মুসলিমদের হাতে তুলে দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়।

তবে এক্ষেত্রে আক্রান্ত বাক্তিকে মৃত্যুর পূর্বেই লিখিত আবেদন দেয়ার কথা বলা হয়েছে। করোনা আক্রান্তের সেবা ও মৃতের সৎকারের নিমিত্তে আমরা ইন্দনেশিয়া থেকে বেশকিছু পিপিই নিয়ে এসেছি।

জরুরি অবস্থা ঘোষণার পর থেকেই দোকানপাট, কলকারখানা, খাবারের হোটেলসহ অনেক কিছুই বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক বাঙ্গালি বেকার হয়ে আর্থিক দৈন্যতার শিকার হয়েছেন। এমতাবস্থায় তারা নিদারুন কষ্টে দিনযাপন করছে কারন শিজুওকাতে একটি সিঙ্গেল রুমের মাসিক ভাড়া প্রায় পঞ্চাশ হাজার ইয়েন গুনতে হয় আর টোকিও তে সিঙ্গেল রুমের জন্য একলাখ ইয়েন দিতে হয় ,বাংলা টাকায় প্রায় আশি হাজার।

আমাদের অনেক মুসলিম ভাইয়েরা তাদের সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। বাংলাদেশেও করোনা আঘাত হানায় নিকট আত্মীয়দের চিন্তায় এখানে অবস্থানরত বাংলাদেশি ভাইদের মনের যাতনা যেন দিগুণ হয়েছে।

পুরুষ-মহিলা সবাই নিজ বাসায় সাধ্যঅনুযায়ী নামাজ, নফল রোযা ও দুয়া জিকির করছেন। প্রত্যেক মুসলমানের এখন একটাই স্বপ্ন- ইনশাআল্লাহ পৃথিবী অচিরেই শান্ত হবে, মসজিদের দরজা খুলে যাবে এবং দেশে ফিরে প্রিয়জনদের সাথে দেখা হবে।

লেখক: পি.এইচ.ডি.গবেষক শিজুওকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাপান এবং সহকারী অধ্যাপক (শিক্ষাছুটি) ফার্মেসী বিভাগ আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম


Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •